বিয়ের পিঁড়িতে বসা হলোনা রাজনের !
সোনারগাঁও থেকে মোবাইলে ডেকে এনে রূপগঞ্জের রূপসী কলাবাগানে হত্যার চেষ্টা ,১৬ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে মৃত্যু
বিশেষ প্রতিনিধি জাগো বাংলাদেশঃ
রাজন খান। ৩০ বছরের টগবগে যুবক। অভাবের সংসার। লেখাপড়াও বেশি দূর এগোতে পারেনি। স্বপ্ন ছিলো চাকুরী করে পরিবারের দুঃখ ঘুঁচাবে। মা-বাবার মুখে হাসি ফুটাবে। ঈদের পর বিয়ের পিঁড়িতে বসবে। ঘাতকরা তার সব স্বপ্ন ফিঁকে করে দিলো।
মা-বাবার মুখের হাসি কেড়ে নিয়ে শোকের চাদরে ঢেকে দিলো। পাওনা টাকা ফেরত চাওয়ায় গত ১৩ মে মাদককারবারী রাজন খানকে সোনারগাঁও থেকে মোবাইল ফোনে রূপগঞ্জে ডেকে এনে জবাই ও কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। তার আত্মচিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। টানা ১৬ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২৯ মে রাতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজন খান মারা যায়। নিহত রাজন সোনারগাঁও উপজেলার আমগাওঁ এলাকার তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে।
নিহতের মামা আলতাফ কাজী জানান, রাজন খান তার বোন রাশেদা আক্তারের ছোট ছেলে। ছোটকাল থেকে বড় হয়েছে তার মামার বাড়ি রূপসী কাজী পাড়ায়। এখানে তার পরিচালনায় একটি সমবায় সমিতি গড়ে তোলে। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার সদস্যের পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকজন মাদককারবারী তাদের পরিচয় আঁড়াল করে সমিতির সদস্য হন। পরে সমিতি থেকে ঋণ তুলেন।
প্রথম অবস্থায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ করলেও একপর্যায়ে টালবাহনা শুরু করে।
মাঝখানে বিয়ে করার জন্য তার মা-বাবা তাকে সোনারগাঁয়ের আমগাঁয়ের বাড়িতে নিয়ে যান। গত ৪ বছর ধরে সে ওখানে বসবাস করছে। এরপর নিজের বাড়িতে থেকেই সমিতির পরিচালনা করতেন। সপ্তাহে-সপ্তাহে এসে কিস্তির টাকা তুলে নিতেন। পাশাপাশি অটো চালিয়ে পুরো সংসার ও মা-বাবার ভরণ-পোষণ করতেন রাজন।
নিহত রাজনের পিতা তোফাজ্জল হোসেন তার বন্ধুদের বরাত দিয়ে বলেন, গত ১৩ মে রাজন তার বন্ধু সুমন মিয়া ও বাদল মিয়ার সঙ্গে বসে ইফতার করে। পরে নামাজ শেষে চায়ের দোকানে বসে চা পান করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এসময় তার মোবাইলে একটি কল যায়। তখন সে তার বন্ধুদের বরপা থেকে পাওনা টাকা আনতে হবে বলে চলে আসে। পরিবারের লোকজন আরো জানান, সমিতির টাকা নিয়ে প্রায় তাকে মোবাইলে ঝগড়া করতে দেখা যেতো। পরিবারের ধারণা, টাকার জন্যই রাজনকে খুন করা হয়েছে।
পুলিশের ধারণাঃ রাজনকে বরপা থেকে দুর্বৃত্তরা তুলে রূপসী কলাবাগানে নিয়ে জবাই ও কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। তার আত্মচিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে উদ্ধার করে বরপা লাইফ এইড হাসপাতালে ভর্তি করান। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেও অবস্থা খারাপ হতে থাকলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গত ২৯ মে রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজন মারা যায়।
মোবাইলে কথা হয় রাজনের মা রাশেদা বেগমের সঙ্গে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বাজান পোলাডায় কইছিলো এই ঈদের(ঈদুল ফিতর}পরে বিয়া করবো। আমার সোনার টুকরার আর বিয়া করা অইলোনা। পোলাডারে ওরা মাইরা ফালাইলো। কত স্বপ্ন দেখতো আমার সোনার চাঁনে। কইতো মাগো-মা, আমি টাকা কামাইয়া সুন্দর বাড়ি বানামু। তোমাগো আরাম-আয়াসে রাখুম।
এহন কেডায় আমাগো আরাম-আয়েসে রাখব বাজান। রাজনের পিতা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, আমার এ পুতে পুরা সংসারটা চালাইতো। আমি চিন্তা করলে কইতো বাবা চিন্তা কইরোনা, আমিতো আছি। গতকাল শুক্রবার (২৯ মে} রাজনের জন্য পঞ্চমী ঘাট মাইয়া (মেয়ে}দেইখা আছি। কথাবার্তা সব ঠিক। আগামী সপ্তাহে দিন-তারিখ করার কথা। এহনতো আমার পোলায়ই নাই। বড় মাইয়া রেখা আক্তার থাহে শ্বশুড় বাড়ি। আর বড় পোলা সুমন খাঁন বিয়া করছে। পোলাপান আছে। জোগালী কাম কইরা কোনমতন চলে। আমাগো বুড়া-বুড়িরে রাজনই খেয়াল রাখতো। অহন আমাগো কেডা খেয়াল রাখবো।
মাদকের ডিপো রূপসী কলাবাগানঃ অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপসী কলাবাগান এলাকা মাদকের ডিপো হিসাবে ব্যাপক পরিচিত। এখানে প্রতিদিন বসে মাদকের আসর। নীরব-নিস্তব্ধ কলাবাগান এলাকা দিয়ে দিনের বেলায় লোকজন যেতে ভয় পায়। আর রাত হলেতো কথাই নেই। মাদকের পাশাপাশি এখানে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটতো অহরহ।
মনোয়ার হোসেন মনার নেতৃত্বে তার সেকেন্ড-ইন কমান্ড সাখাওয়াত ও তার বাহিনী কলাবাগান এলাকার অপরাধ সা¤্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানা গেছে। আর কলাবাগানের পাশ থেকেই রক্তাক্ত অবস্থায় রাজনকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা।
প্রশাসনের বক্তব্যঃ রূপগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মাহমুদুল হাসান বলেন, এ ঘটনায় ঐ সময় একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলো রাজনের পরিবার। অপরাধীদের ধরতে পুলিশের বিশেষ টিম মাঠে রয়েছে।
