মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
এক সময়কার খাল এখন নদী রূপ পাচ্ছে। কয়েক বছর আগের যে খালের প্রসস্থ ছিল প্রায় ৫৫ ফুট। সে খালগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ খালগুলোর প্রসস্থ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। খালের পাড়ের মানুষ অনেকেই খালে গোসল করতেন। অনেকেই খালের তলদেশ থেকে ডুপ দিয়ে মাটি উঠাতে পারতেন হাত দিয়ে। এখন অনেক খালে গোসল করা ছেড়ে দিয়েছেন অনেকেই। খালের প্রসস্থ এতটাই বেড়েছে, দেখতে নদীর মতো লাগে। অভিযোগ স্থানীয়দের রাতের আধারে ও দিনে সমান তালে খাল থেকে বালু উত্তলন করা হয়। এর ফলে অনেক খাল এখন নদীর আকার ধারণ করেছে।

বেড়ে গেছে নৌ যান চলাচল, শান্ত খালে এখন অশান্ত ঢেউ দিন-রাত। খালগুলো গভির হওয়ায় খালের উভয় পাশে দেখা দিয়েছে ভাঙন। আর এ ভাঙনের ফলে খালগুলো প্রস্থ হচ্ছে। এরফলে প্রতি বছরই মুন্সিগঞ্জ জেলারএকাধিক ইউনিয়ন এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। বসতবাড়িসহ অনেকেই হচ্ছেন ভূমি হীন। বষাকালে বেশি ভাঙণের কবলে পড়েন খালের পার ও নদীর বসবাসকারীরা। জানা গেছে, স্থানীয়রা এবিষয়ে প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দফতরকে অবগত করা হলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। টঙ্গীবাড়ি উপজেলার দিঘীরপাড়, হাইয়ারপাড়, সরিষাবন,বড়াইল, ভাঙ্গনিয়া, বাগের পার, দশত্তর, বাগবাড়ি, চৌসাড় ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পূর্বরাখি, দেওয়ানকান্দি এলাকায় পদ্মার ভাঙন
বৃষ্টি ও উজান হতে নেমে আসা ঢলের পানিতে পদ্মানদীতে এখন প্রচন্ড ¯্রােত বইছে। ¯্রােতের কারণে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার হাইয়ারপাড় এলাকা থেকে দিঘীরপাড় বাজার পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার শিলই ইউনিয়নের পূর্বরাখি এলাকা থেকে দেওয়ানকান্দি পর্যন্ত ১ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ১২ বছর ধরে চলছে এ ভাঙন। এতে বিলীন হচ্ছে বাড়ি-ঘড় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। অবৈধভাবে নদী থেকে মাটি উত্তোলনের কারণে দিনে দিনে ভাঙনের তীব্রতা আরো বেড়েছে। অথচ ভাঙন রোধে নেওয়া হচ্ছেনা কোন ব্যবস্থা।
স্থানীয় ও ভাঙন কবলিত ভুক্তভুগীরা জানান, নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন, কয়েক দিন পর পর বৃষ্টি, অন্যদিকে নদীতে প্রচন্ড ¯্রােত। এ কারণে প্রতিদিন নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই একটু একটু করে ভাঙছে এ নদীটি। টঙ্গীবাড়ি উপজেলার দিঘীরপাড়, হাইয়ারপাড়, সরিষাবন,বড়াইল, ভাঙ্গনিয়া, বাগের পার, দশত্তর, বাগবাড়ি, চৌসাড় ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পূর্বরাখি, দেওয়ানকান্দি এলাকায় পদ্মার ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙন কবলিত মানুষ রাস্তার পাশে অন্যর জমি ভাড়া নিয়ে ঘর উত্তোলন করে তাতে বসবাস করছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মার ভাঙন কবলিত এ শাখা নদীতে প্রচন্ড ¯্রােত বয়ে যাচ্ছে। হাইয়েরপাড় এলাকা ধরে দিঘীর পাড় বাজার পর্যন্ত যাওয়ার সময় নদী ভাঙতে দেখা যায়। ভাঙনের কারণে স্থানীয়রা তাদের বাড়ি ঘর অন্যত্র সড়িয়ে নিচ্ছে। হাইয়ারপার জামে মসজিদটি মাটি সড়ে গিয়ে বাকাঁ হয়ে পদ্মা নদীর দিকে হেলে পরেছে । যে কোন মুহুর্তে মসজিদটি পদ্মায় বিলীন হতে পারে।
এসময় জানাযায়, চলতি বর্ষা মৌসুমে শুধু হাইয়ারপাড় এলাকার সুজ্জত আলী বেপারী, সায়েদ হালদার, নুরুল হক হালদার, আ. খালেক শেখ, ইদ্রিস হালদার, করিম হালদার, রহিম হালদারসহ কমপক্ষে ২৫টি পরিবারের বাড়ি পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
হাইয়ারপাড় এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য করিম হালদার বলেন, পদ্মার শাখা নদীটি বর্তমানে ১ কিলোমিটারেরও বেশি চওড়া। গত ২০-২৫ বছর আগে এটি ৩০-৪০ ফুট চওড়া একটি খাল ছিল। অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে খালটি একটু একটু করে বড় হতে থাকে। এর পর এটি ছোট নদীতে রূপ নেয়। বর্ষা মৌসুমে নদীর ¯্রােত বাড়তে থাকে। এর ফলে গত ১২-১৪ বছর ধরে ভাঙন শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে ভাঙনের মাত্রা কম হলেও বছর বছর তা প্রকট আকার ধারণ করছে।
আব্দুল খালেক শেখ নামে এক ব্যাক্তি জানান, তার বসত বাড়ির একটি ঘর এ বছর পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। পাশের ছোট একটি ঘরে পরিবারে ৬ জন সদস্য নিয়ে বসবাস করছেন। ওই ঘরটিও যে কোন দিন নদীতে বিলীন হতে পারে। নদীটির এক কিলোমিটার দক্ষিণে তাদের বসত ভিটা ছিল। ভাঙনের কারনে এক কিলোমিটার উত্তরে এসেছেন। সেখানেও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। তিনি আক্ষেপের সাথে জানান, পদ্মা নদী হতে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের কারণে ভাঙনের তীব্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ভাঙন কমাতে নদীতে বাঁধ, অবৈধ মাটি উত্তোলন বন্ধ করতে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছেনা।
উপজেলার কামারখাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন হালদার জানান, ভাঙনে কামাড়খাড়া ইউনিয়নের বিলেরপাড়, বড়াইল, বাগবাড়ি, ভাঙ্গনিয়া গ্রামের অনেক পরিবারের ঘর বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। এই অঞ্চলের শত শত একর আবাদী জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। দিঘিরপাড় বাজারের নদীর বিপরীত পারে চরাঞ্চলের আবাদী কৃষি জমি পদ্মায় বিলীন হচ্ছে। বিগত এক যুগের পদ্মার ভাঙনে উপজেলার দিঘিরপাড় ও হাসাইল ইউনিয়নের ৯০ ভাগ অংশ এবং পাচঁগাওঁ ও কামারখাড়া ইউনিয়নের প্রায় অর্ধেকাংশ পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ১০ বছর আগে পাচগাওঁ ও হাসাইল অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও কামারখাড়া, দিঘিরপার এলাকায় কোন বাধ নির্মাণ হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাক্তি জানান, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ সাগুফতা ইয়াসমিনের নির্বাচনী এলাকা এটি। সাংসদ নিজের বাড়ি লৌহজংয়ে ভাঙণ রোধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আমাদের এলাকার জন্য কোন ব্যবস্থা তিনি নিচ্ছেন না।
এ বিষয়ে জানতে সাগুফতা ইয়াসমিনের মুঠোফোন একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার সহকারির সাথে যোগাযোগ করেও সাংসদের সাথে কথা বলা যায়নি।
তবে টঙ্গীবাড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান জগলুল হালদার জানান, এ নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। ভাঙনের কারণে প্রতিবছর নদীগর্ভে ঘর-বাড়ি, বাজার বিলীন হচ্ছে। ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে শিলই ইউনিয়নের ইসমাঈল বেপারি ও মহিউদ্দিন হালদারা নদী থেকে মাটি উত্তোলনের কারণে ভাঙন অব্যাহত আছে। পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী এসেছিলেন, বরাদ্দের আশ্বাস দিয়েছেন।
মুন্সীগঞ্জ পানি সম্পদ অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী রকিবুল ইসলাম জানান, লৌহজং উপজেলার সামুরবাড়ি হতে টঙ্গীবাড়ি উপজেলার হাইয়ারপাড় পর্যন্ত ১২.৯ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মানের জন্য ৫৮৩ কোটি টাকার ইষ্টিমেট তৈরি করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডে একটি হিসেব পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাই করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু করা হবে। এর মধ্যে দিঘীরপাড় বাজার থেকে হাইয়ারপাড় এলাকার অতিরিক্ত ভাঙন কবলিত দেড় কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
