গাজীপুর প্রতিনিধি
মোঃ হোসেন ওরফে আপন (১৯), মোঃ ইমন রায়হান (১৮)ও মোঃ রায়সুল ইসলাম রিফাত (১৯)তারা পরস্পর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।হঠাৎ তিন বন্ধুর মনে আশা জেগেছে তারা বড় সন্ত্রাসী হবে।গড়ে তুলবে বড় একটি সন্ত্রাসী গ্যাং ।সর্ব স্তরের মানুষ তাদের নাম শুনলেই ভয়ে কেপে উঠবে। অর্জন করবে প্রচুর অর্থ-সম্পত্তি। কিভাবে শুরু করবে তাদের এই পথ চলা।এই ভবিষ্যত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হোসেন তার দুই বন্ধুকে জানায় চাচা মোঃ সিদ্দিক বেপারীর কথা।
হোসেন তার দুই বন্ধুকে জানায়, তার চাচার অনেক টাকা। গাজীপুর সদর থানার বিলাশপুর এলাকায় ছয় তলা বাড়িতে চাচা মোঃ সিদ্দিক বেপারী ও তার পরিবার এবং তাদের একমাত্র ছেলে মো. দেলোয়ার হোসেন (২০) ও তার ছেলের বউকে নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে। চাচার বাড়িতে ১০-১৫ লাখ নগদ টাকা ও অনেক স্বর্ণলংকার পাওয়া যেতে পারে বলে দুই বন্ধুকে জানায় হোসেন। এসবের মালিক হতে পরিবারের সবাইকে হত্যা করতে হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২ নভেম্বর সকালে কিলিং মিশন সফল করতে তিন বন্ধু ব্যাগে চাকু ও রশি নিয়ে আশুলিয়া থেকে গাজীপুরের বিলাশপুরে চাচার বাড়িতে রওনা হয়। দুপুরের দিকে বাসায় পৌঁছলে ভাতিজা ও তার দুই বন্ধুকে খুব আদর-যত্ন করে সিদ্দিকের পরিবার।পরে তিন বন্ধু রাতের খাবার খেয়ে বাসার ছাদে বসে হত্যার ছক আঁকে।
পরদিন ৩ নভেম্বর ভোরে সিদ্দিক বেপারী ফজরের নামাজে গেলে তখনই তারা কিলিং মিশন শুরুর পরিকল্পনা করে। সিদ্ধান্ত হয় প্রথমে চাচিকে হত্যা করবে। এরপর চাচা মসজিদ থেকে ফিরলে তাকেও হত্যার পর চাচাতো ভাই দেলোয়ারকে হত্যা করবে। সবশেষে ভাবীকে তিনজন মিলে ধর্ষণ করবে; পরে তাকেও হত্যা করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যাবে। এতে তাদের সব স্বপ্ন পূরণ হবে।
হোসেনের স্বপ্ন ছিল চাচার পরিবারের সবাইকে হত্যা করে লুটে পাওয়া অর্থ ও সোনা বিক্রি করে একটি ফ্ল্যাট, একটি পিস্তল ও মোটরসাইকেল কিনবে। রিফাত এবং রায়হানের স্বপ্ন ছিল তারাও দুটি পিস্তল ও মোটরসাইকেল কিনে বড় সন্ত্রাসী হয়ে তাদের সন্ত্রাসী জীবন পরিচালনা করবে।
ঘটনার দিন ভোরে ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যান হোসেনের চাচা সিদ্দিক বেপারী। তিনি বেরিয়ে গেলে র্নিঘুম রাত কাটানো তিন যুবক তাদের কিলিং মিশন শুরু করে। সিদ্দিকের স্ত্রী রিনা আক্তারকে (৪৫) ঘুম থেকে ডেকে গলায় রশি পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে বিছানায় শুইয়ে রাখে।
নামাজ শেষে চাচা বাড়ি ফেরা মাত্র তাকেও রশি দিয়ে বেঁধে জবাই করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। শুরু করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে সিদ্দিকের শরীরে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এক পর্যায়ে সিদ্দিক মৃত্যুর ভান ধরে ফ্লোরে শুয়ে থাকে। ঘাতকরাও তাকে মৃত মনে করে আলমারির তালা ভেঙে ৩ লাখ টাকা ও বিপুল সোনা-গয়না লুটে চাচাতো ভাই দেলোয়ারের শোবার ঘরে যেতে থাকে। একইসময় আহত সিদ্দিক কোনও রকমে সিঁড়ির কাছে গিয়ে চিৎকার দিয়ে অচেতন হয়ে যায়। তখন সকালের আলো ফুটেছে কেবল। চিৎকার শুনেই আশপাশের লোকজন ছুটে আসা শুরু করে; তখন ঘাতকরা ও কিলিং মিশন শেষ না করে কাঁধে ব্যাগ ও রক্তাক্ত জামা পরে পালিয়ে যায়।
না, এটি কোনো সিনেমা বা নাটকের গল্প নয়। তেমনটি মনে হলেও এই ঘটনাই ঘটেছে গাজীপুর মহানগরের বিলাশপুর এলাকায় গত ৩ নভেম্বর রিনা আক্তার খুনের অন্তরালের কাহিনী এটাই। উপরোল্লেখিত তিন কিশোরকে র্যাব আটক করার পর এ তথ্য দিয়েছে তারা। গতকাল শুক্রবার রাতে তাদেরকে আটক করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে র্যাব-১ স্পেশালাইজড কোম্পানী পোড়াবাড়ী ক্যাম্প কমান্ডার লে. কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল-মামুন।
গ্রেফতারকৃতরা হলো, মো. হোসেন ওরফে আপন (১৯) ভোলার বঙ্গেরচর (নদী ভাঙ্গা) এলাকার তার বাবা প্রয়াত আব্দুল হামিদ বেপারীর ছেলে। রায়সুল ইসলাম রিফাত (১৯) ঢাকার সাভার থানার ঝাউচর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে। ইমন রায়হান (১৮) মাগুরার মোহাম্মদপুর থানার নারায়নপুর গ্রামের জহির রায়হানের ছেলে।তারা পরস্পর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
লে. কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, আমরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারি, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত মোঃ রায়সুল ইসলাম রিফাত আশুলিয়া এলাকায় আত্মগোপন করে আছে। সেখানে অভিযান চালিয়ে রিফাতকে গ্রেফতার করা হয়। র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং ঘটনার সাথে জড়িত তার অপর দুই বন্ধু হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা হোসেন এবং রায়হানের নাম প্রকাশ করে। তার দেওয়া তথ্যমতে রায়হানের নানা বাড়ি মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর বাজার থেকে মোঃ হোসেন ওরফে আপন এবং মোঃ ইমন রায়হানকে গ্রেফতার করা হয়।
