নজরুল ইসলাম লিখন
‘জীবনের হগল কামাই শেষ কইরা ফালাইছি, ভাই। জুয়া খেলাই নেশা আর পেশা। জমি যা আছিল হগল বেইচ্যা শেষ। বউ রাগ কইরা বাফের (বাপের) বাইত চইলা গেছেগা। অহন সারা দিন রিকশা চালাই, রাইতে জুয়া খেলি। কোনোভাবেই ছাড়বার পারতাছি না।’ এ কথাগুলো বলছিলেন তালাশকুর গ্রামের এক ব্যক্তি। লজ্জায় তিনি পত্রিকায় নাম না ছাপানোর অনুরোধ করেন।
দাউদপুরের কালনী গ্রামের এক নারীর বিয়ে হয়েছে তিন বছর আগে। বিয়ের পর কয়েক দিন সময় দিলেও এর পর থেকে রাত হলে বাড়ির বাইরে থাকেন স্বামী। দেড় বছর আগে সংসারে আসে ফুটফুটে ছেলেসন্তান। এর পরও স্বামী হেলাল মিয়া থেমে নেই। রাত হলেই চলে যান জুয়ার আসরে। কয়েক মাস আগে জুয়া খেলায় হেরে গিয়ে স্ত্রীকেই বাজি ধরেন। পরে স্ত্রীর কানের দুল বিক্রি করে জুয়াড়ির টাকা শোধ করেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ৭০০ স্পটে জুয়ার আসর বসে।
এসব আসরে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতবদল হয়। এ হিসাবে মাসে হাতবদল হয় প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এখান থেকে পুলিশ প্রতি মাসে বখরা পায় ১০ লাখ টাকা। এসব জুয়ার স্পট বন্ধের ব্যাপারে এলাকাবাসী থানা পুলিশের সহযোগিতা চাইলেও কোনো প্রকার সহায়তা পায় না। উপজেলার ১০০ স্পটের ব্যাপারে থানা পুলিশ অবগত রয়েছে। তাই এসব স্পটকে বলা হয় পারমিটেড (অনুমোদিত)। আর বাকিগুলোকে বলা হয় চোরাই বোর্ড। তবে সব স্পট থেকেই বখরা পায় পুলিশ, জনপ্রতিনিধি তথা রাজনৈতিক নেতা ও সন্ত্রাসীরা।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, জুয়াড়ি ও আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে চমকপ্রদ তথ্য। তারা জানিয়েছে, উপজেলার কায়েতপাড়া, দাউদপুর, ভোলাবো, মুড়াপাড়া, ভুলতা, রূপগঞ্জ সদর ও গোলাকান্দাইল ইউনিয়নে রাতে-দিনে ৪০০ স্পটে জুয়ার আসর বসে। এ ছাড়া তারাবো, কাঞ্চন পৌরসভা এবং চনপাড়া বস্তিতে বসে আরো ৩০০ স্পট। জুয়াড়িরা জানিয়েছে, এসব স্পটে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি টাকার খেলা চলে। এ হিসাবে বছরে প্রায় ৫৪০ কোটি টাকা হাতবদল হয়। কয়েকজন জুয়াড়ি জানায়, তাস দিয়ে নানা রকম জুয়া খেলা হয়।
গ্রামের দোকানগুলোতেও তাস বিক্রি হয়। হাজার থেকে শুরু করে এক বাজিতে অর্ধলক্ষ টাকা পর্যন্ত জুয়া খেলা হয়। স্থানীয় স‚ত্রে জানা গেছে, রূপগঞ্জের ১২৮টি গ্রামের ঘরে ঘরে চলে জুয়ার আসর। জুয়ার টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে বাড়ছে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে এবং অভিভাবকদের কাছে টাকা চেয়ে না পেয়ে বিভিন্ন গ্রামে গত তিন মাসে জুয়াড়ি সন্তানের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন অর্ধশতাধিক পরিবারের মা-বাবা ও অভিভাবক। জুয়ার টাকার জন্য চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি করতে গিয়ে গত দুই মাসে আটক হয়েছে ২২ জন। এ ছাড়া আসরে এক শ্রেণির সুদি মহাজন জুয়াড়িদের চড়া সুদে টাকা দেয় বলেও জানা গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ি, জঙ্গল, বড় গাছের তলা, পুকুর পাড় ও ঝোপের আড়ালে বসে জুয়ার আসর। আবার খোলা আকাশের নিচে, নয়তো তাঁবু টাঙিয়ে বাসানো আসরও দেখা গেছে। ইঞ্জিনচালিত ট্রলার কিংবা নৌকায় বসেও জুয়াড়িদের খেলতে দেখা গেছে। কখনো রাতে, আবার কখনো দিনে চলে ওই সব আসর। উপজেলার কামশাইর, নগরপাড়া, তালাশকুর, বরুণা, চনপাড়া বস্তি, বরপা (বাগানবাড়ি), মাসাবো, হাটাব, ইছাপুরা, গুতিয়াবো, উত্তরপাড়ার তুহিন সাহেবের বাগানবাড়ি, গন্ধবপুর চর, ব্রাহ্মণখালীর মাঠ, আধুরিয়া, কাঞ্চন (দক্ষিণবাজার শীতলক্ষ্যার পাড়), কাঞ্চন চৌধুরীপাড়া, রানীপুরা, করাটিয়া, আতলাপুর বাজার, কালনি, গোবিন্দপুর, কান্দাপাড়া, তেতলাবো, মাহনা, মিরকুটিরছে, নোয়াপাড়া, ভুলতা মিয়াবাড়ি ঘুরে জুয়ার আসর দেখা গেছে। এসব জুয়ার আসরে প্রতিদিন সর্বস্বান্ত হচ্ছে শত শত লোক।
নগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন নাগরী বলেন, ‘জুয়া একটা নেশা। এ নেশা মাদকের মতোই। গোটা রূপগঞ্জে জুয়ার আসর বেড়ে গেছে। প্রশাসনকে এ ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। পাশাপাশি জুয়াড়িদের পরিবার ও এলাকাবাসী মিলে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।’ লায়ন মোজাম্মেল হক ভ‚ঁইয়া বলেন, ‘তরুণদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি খেলাধুলায় মনোনিবেশ করতে হবে। তাহলে হয়তো মাদক আর জুয়া থেকে তরুণদের বাঁচানো সম্ভব হবে।’ প্রকাশ্য জুয়া আইন ১৮৬৭ অনুযায়ী, জুয়া খেলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ জন্য সর্বোচ্চ দুই মাসের জেল ও সর্বোচ্চ ২০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জজকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ আলী পিন্টু খান বলেন, ‘জুয়া বন্ধে এই আইনটি যুগোপযোগী করে শাস্তি বাড়ানো উচিত। একই অপরাধ বারবার করলে একই শাস্তি হতে পারে না।’ রূপগঞ্জ থানার ওসি মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘জুয়াড়িরা বসে সাধারণত জলাশয়ের পাশে। ধাওয়া দিলে বিপদ হয়। কেউ যদি পানিতে গিয়ে পড়ে মারা যায় তখন উল্টো সমস্যা তৈরি হয়। হত্যা মামলার চেয়ে তো জুয়াড়ি গ্রেপ্তার জরুরি হতে পারে না। তা ছাড়া লোকবল কম।’ পুলিশের বখরার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘পুলিশ তো অভিযান পরিচালনা করে না। তাহলে বখরা নেবে কিভাবে? তার পরও যদি কেউ নিয়ে থাকে তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম বলেন, ‘জুয়াও একটা অপরাধ। শিগগির ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের মতো জুয়াড়িদেরও সাজা দেওয়া হবে।
