আফসার বিপুল গাজীপুর
জাতীয় ফুল শাপলা। এই ফুলের সৌন্দর্য্য আপন মহিমায় মুগ্ধ করে সবাইকে। খালে, বিলে সবচেয়ে বেশি শাপলা জন্মায়। খাল, বিল থেকে কুড়িয়ে শাপলা সংগ্রহ করেন অনেকেই। এ শাপলা বাজারে বিক্রয় করাও যায়। শাপলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন অনেক গরীব মানুষ। শাপলার সৌন্দর্য যেমন সুন্দর তেমনি এটা পুষ্টি গুনে ভরপুর। খালে-বিলে যখন বেশি পানি থাকে তখন শাপলা জন্মায়। এলাকার কম আয়ের মানুষ দিনের একটা সময় শাপলা কুড়ান। পরে তা হাট-বাজারে বিক্রি করে থাকেন। তা বিক্রি করে যা পান তা দিয়ে সংসারের ছোট-ছোট চাহিদা মেটান।
শাপলা ফুল সাদা,লাল ও বেগুনি এই তিন রংয়ের হয়ে থাকে। সাদা ফুল বিশিষ্ট শাপলা সবজি হিসেবে এবং লাল রঙ্গের শাপলা ঔষধি কাজে ব্যবহৃত হয়। শাপলা ফুল খুব পুষ্টি সমৃদ্ধ সবজি। সাধারণ শাক-সবজির চেয়ে এর পুষ্টিগুণ অনেক বেশি । গ্রামগঞ্জের মানুষ শাপলা কম খেলেও শহরের শিক্ষিত মানুষ শাপলা শবজি মনে করেই খান।
বর্ষা মৌসুমে বেলাই বিলের বিস্তীর্ন জলাভূমি জুড়ে প্রচুর শাপলা ফুটে। আর বেলাই বিলের এই শাপলা তুলে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন বেলাই বিলের চারপাশে বাস করা কয়েকশত মানুষ। একি পরিবারের একাধিক সদস্যরা এ শাপলা কুড়ানোর কাজে ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত।
গাজীপুরের কালিগন্জ উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়নের দুর্বাটি এলাকায় শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন ঐ এলাকার কয়েকশত মানুষ। ভোরের আলো ফুুুটার সাথে সাথেই মানুষ গুলো ছুটে চলে জীবিকার তাগিদে জলাভূমির বুক চিড়ে শাপলা তুলার জন্য । শাপলা তুলে ভরদুপুরে সব শাপলা একসাথে করে ছুটে চলে বাজারে বিক্রি করার জন্য। আর এই আয় থেকেই চলে তাদের সংসার। মুখে উঠে দু মুঠো অন্ন।
গাজীপুরের কালিগন্জের এ মানুষ গুলো মূলত কৃষক শ্রেণীর। বছরের অন্যান্য সময় কৃষি কাজে ব্যস্ত থাকলেও বর্ষার সময়টাতে হাতে কোন কাজ থাকেনা তাদের। তখন জীবন ধারণ করা কার্যত অনেক কষ্টকর হয়ে যায় এই শ্রেণীর মানুষের জন্য । আর এই বর্ষার সময়টাতে তারা শাপলা তুলে পরিবারের মুখে দু মুঠো অন্ন তুলে দেন আর স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাতে পারেন কয়েকটা মাস।
আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত বিলে প্রচুর শাপলা ফুটে আর এসময়টাতে তারা অন্যান্য সময় থেকে বেশি শাপলা তুলতে পারেন। পানি যত গভীর সেখাকার শাপলা তত ভালো হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,বক্তারপুর ইউনিয়নের দুর্বাটি এলাকার চারদিক অথৈ পানিতে তলিয়ে আছে। ডিঙি নৌকা দিয়ে কেউ বিলে মাছ ধরছে। আগাছা পরিস্কার করে নৌকা নিয়ে বিলের গহিনে যাচ্ছে শাপলা তুলতে ।আর বিল থেকে শাপলা তুলে জমা করছে নৌকায়।নৌকায় করে শাপলা এনে বাজারে বিক্রি করার জন্য মহাসড়কের পাশে স্তুপ করে রাখছে।
স্থানীয় আব্দুল কাইয়ুম বলেন,তিনি জন্মের পর থেকেই এ বিলে শাপলা ফুল ফুটতে দেখছেন আর এখানকার বেলাই বিলের শাপলা তুলে স্থানীয় বাজার ও ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে বিলের পাশ্ববর্তী এলাকার অসংখ্য পরিবার জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন।
দুর্বাটি গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানান, বছরের পাচঁ মাসই এই বিলের শাপলার ওপর নির্ভরশীল অনেক পরিবার। এদের কেউ শাপলা তুলে, কেউবা বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন আসছেন এলাকার অন্তত কয়েকশত পরিবার। বিলে আষাঢ় থেকে শুরু করে কার্তিক মাস পর্যন্ত শাপলা ফুল পাওয়া যায়।
১৬-১৭ বছর যাবত শাপলা তুলে জীবিকা নির্বাহ করা আমিন (৩০) জানান,বর্ষা মৌসুমে কাজ না থাকাই শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করে অন্য সময় থেকে এসময়টাতে খুব সুন্দর ভাবে চলতে পারি।বর্ষার মৌসুমে প্রতিদিন সকালে আমরা কয়েকটা গ্রুপে ভাগ হয়ে আমরা শাপলা তুলতে যায়। প্রতি গ্রুপে ১০-১২ সদস্য থাকে।প্রতি গ্রুপের সদস্যরা মিলে দুই আড়াইশো কুড়ি শাপলা তুলতে পারি। আর আমাদের দৈনিক ৮০০-১০০০ টাকা আয় হয় যা বছরের অন্য সময় থেকে বেশি। বছরের অন্য সময়টাতে সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয় , কিন্তু এ সময়টা আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে।
দূর্বাটি গ্রামের সফিকুল ইসলাম(২৮) বলেন, আমাদের মতো গরীব মানুষগুলোর সারা বছর খুব কষ্ট করতে হয়। তিন বেলা খাবার জুটানো খুব কষ্টের হয়ে দাড়াঁয় তবে এ মৌসুমে আমরা খুব ভালো চলতে পারি।
ইব্রাহিম(৪০) বলেন অন্য ব্যবসায় পুঁজি লাগে কিন্তু শাপলার ব্যবসায় পুঁজি লাগে না। আমাদের গরীবদের জন্য এ ব্যবসাই ভালো। কয়েকটা দিন অন্তত পেট ভরে কয়টা ভাত খেতে পারি। তবে শাপলা প্রতি বছর এক জায়গায় ফুটেনা।
গাজীপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাহবুব আলম জানান, শাপলা ফুল প্রাকৃতিক ভাবে পুরাতন বিল এবং ঝিলে জন্মে।এর চাষ পদ্ধতি এখনো প্রচলিত হয়নি। শাপলা ফুল সাধারণ সবজি থেকে অনেক বেশি পুষ্টি ভেষজ গুনে ভরপুর।এটি আলু থেকেও ৭ গুন বেশি ক্যালসিয়ামে ভরপুর। এ্যালার্জি,চর্মরোগ,আমাশয়, এ্যাসিডিতেও এটা বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখে। মানষিক রোগেও এর ব্যবহার করা হয়।
