বিশেষ প্রতিবেদক
একটি রাত অনেক বড়! একটা দিন অনেক ছোট! গ্রামের বাড়ি। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ। ঘুম ভাঙ্গাতে পাখিরাই যথেষ্ঠ। ভোর থেকে শুরু হয় জীবিকার সন্ধানের কাজ। দুপুরের পর থেকে গাড়িতে গাড়িতে ও স্ট্যেশনে চলে রাত পর্যন্ত কর্মব্যস্ততা। ঘরে ঘরে চলছে বিন্নি খৈ তৈরিতে ব্যস্থ জি,বৌ রা। ভাজা খৈ বিক্রি করে প্রায় ৩ শতাধিক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করছে। আবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হচ্ছে। এ খৈয়ের চাহিদা পুরো বছর জুড়ে থাকায় এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে রাখছেন খৈ বিক্রেতারা।
শীতের আগমনে গ্রাম-গঞ্জে শুরু হয় নানারকম মেলা, চলে বৈশাখ পর্যন্ত। এসব মেলার আকর্ষণ মুড়ি, ফুট খৈ, বিন্নি খৈ। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মুখরোচক খৈ হলো বিন্নি খৈ। এই খৈ গ্রামবাংলার লোকসমাজের চিরায়ত ঐহিত্য মেলা বা পার্বণকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়। চিড়া, মুড়ি ও বিন্নি খৈ তৈরির প্রস্তুতিই জানান দেয় মেলা বা পার্বণের আগমনী বার্তা।
ভুট্টা ও বিন্নি খৈ বিক্রি করে অনেকেই এ পেশায় ২৫ বছর পার করেছেন। এ পেশায় জড়িতদের বছরের বেশিরভাগ সময়ই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সময় কাটাতে হয়। তারপরও এ পেশায় জীবিকা নির্বাহ করে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
এলাকার কৃষকগণ কিছু বাড়তি আয়ের আশায় বিন্নি ধান চাষ করে থাকে। এ ধান অন্যান্য ধানের মত এত ফলন হয় না। প্রতি বিঘায় ৭-৮ মণ ধান হয়ে থাকে। ফলে এর দামও বেশি। যখন ৭-৮শ টাকা মণ অন্যান্য ধান পাওয়া যায় তখন এ ধানের দাম থাকে ১৫-১৬শ টাকা মণ। কখনও কখনও এর দাম ২৩-২৫শ টাকা পর্যন্তও হয়ে থাকে। এই ধান থেকেই বিন্নি খৈ তৈরি করা হয়। খৈ তৈরির প্রক্রিয়াটি একটু কষ্টকর এবং সময়সাপেক্ষ।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার সনমান্দি ইউনিয়নের দৌলতপুর, জাঙ্গাল, গোপেরবাগ, বড়ইকান্দি, হযরতপুর, কাটাকালী, কাফাইকান্দি, পাঁচানিসহ ১১ গ্রামের ৩ শতাধিক পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ ২০-৩০ বছর ধরে বিন্নি ও জয়নার ধানের খৈ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। অল্প পুঁজি খাটিয়ে অধিক মুনাফা পাওয়ায় খৈ বিক্রেতারা এ পেশায় আকৃষ্ট হন। তাছাড়া সারা বছরই এ খৈয়ের চাহিদা থাকায় ক্ষুুদ্র ব্যবসায়ীরা এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে রাখছেন। নগদ টাকা ও ভাঙ্গাড়ির বিনিময়ে খৈ বিক্রি করে থাকেন। আবার ওই সব ভাঙ্গাড়ি কেজিতে অন্যত্র বিক্রি করে দেন।
বাবুরকান্দী গ্রামের খৈ বিক্রেতা মোকুল জানান, ওই এলাকায় প্রথমে ফেরি করে বিন্নির খৈ বিক্রি শুরু করেন তার বাবা জাব্বার মিয়া। পরে আশপাশের কয়েকটি গ্রামে বিস্তার লাভ করে। তিনি বলেন এ গ্রামের মুক্তার হোসেন এ পেশায় ২০ বছর পার করেছেন। খৈ তৈরি শেষে ৪ থেকে ৮ জনের দলে বিভক্ত হয়ে বেরিয়ে পড়েন চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বাসা ভাড়া নিয়ে অবস্থান নেন বিভিন্ন এলাকায়। ফেরি করে নগদ টাকা ও ভাঙ্গাড়ির বিনিময়ে খৈ বিক্রি করেন। খৈ বিক্রির সুবাদে তাদের ১০-১৫ দিন বাড়ির বাইরে কাটাতে হয়।
ভুট্টা ও বিন্নির খইয়ের চিনি ব্যবহার করে স্বাদ বৃদ্ধি করা হয়। দুই ধরনের খইয়ের প্রতিই ক্রেতাদের সমান চাহিদা রয়েছে এই খৈটি যদিও মুড়ির মতই চাল থেকে ভাজা হয় কিন্তু দেখতে অনেকটা ফুট খৈ এর মত। তবে অপেক্ষাকৃত ছোট। রং ধবধবে সাদা। দেখতে আকর্ষণীয়, লোভনীয়। দুধসহ বা দুধ ছাড়াই গুড়, জিলাপী বা চিনি মিশিয়ে খেলে এর স্বাদের তুলনা করা কঠিন।
গ্রামের সিরাজ মিয়ার সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি প্রতি মণ খৈ সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা দরে নিয়ে বিভিন্ন মেলায় সাড়ে সাত থেকে আট হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করেন। এ কাজ করে এলাকার প্রতিটি পরিবারে মেলা-পার্বণের সময় ৪০-৬০ হাজার টাকা বাড়তি আয় হয়ে থাকে।
সনমান্দী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহিদ হাসান জিন্নাহ জানান, সরকার তাদের সহজ শর্তে ঋণ দিলে এ ক্ষুদ্র ব্যবসারও প্রসার ঘটানো সম্ভব। এ ব্যাপারে ক্ষুুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রতি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
