
ওমর ফারুক শামীম, ইউরোপ প্রতিনিধি: প্রবাস মানে বিদেশ বা দূরদেশ, প্রবাস মানে আত্মীয়স্বজন বিহীন বছরের পর বছর একাকী কাটিয়ে দেয়া, প্রবাস মানে দেয়ালবিহীন কারাগার, প্রবাস মানে শত দুঃখ কষ্টের সঙ্গে বিরামহীন জীবন যুদ্ধ করা। প্রবাস জীবন আকর্ষণীয় হলেও পেছনে থাকে অন্যকিছু। কেউ হয়তো কর্মজীবনের কিছু সময়ের জন্য , কেউ সারা জীবন কাটাতে আবার কেউ উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রবাসী হন। এ জীবন কারো জন্য হয় সুখের, কারো জন্য দুঃখের। দেশ থেকে মানুষ বিদেশ যায় দেশের মানুষগুলোকে ভালো ও আনন্দে রাখার জন্য।
ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় জীবিকার তাগিদে কারো ছেলে কারো মেয়ে, কারো ভাই কারো বোন, কারো বাবা কারো মা, কারো স্বামী কারো বউ যখন পরিবারের অন্য সবার সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে দেশান্তরী হয় তখন এই দেশান্তরী হওয়া মানুষগুলোকে আমরা বলি প্রবাসী।
একবার নামের পাশে প্রবাসী ট্যাগ লেগে গেলে তার আর না থাকে বাড়ি, না থাকে দেশ। দূরপ্রবাসে হয় ভিনদেশী, নিজের দেশে প্রবাসী আর নিজ বাড়িতে মেহমান।
অন্যকে ভাল রাখতে দূরপ্রবাসে এসে একজন প্রবাসীর জীবন কিভাবে যাচ্ছে এই খবর নেওয়ার মানুষ খুব কম হলেও দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীদের ভূমিকা কিন্তু কম নয়।
বেশিরভাগ প্রবাসীই নিজের কামানো টাকার সবটুকুই দেশে পাঠিয়ে দেন ক্ষেত্রবিশেষে পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য ধার করেও দেশে টাকা পাঠান।
নিজের, পরিবারের ও দেশের ভাগ্য পরিবর্তন করতে প্রবাসে এসে অনেক প্রবাসী দেশে যাচ্ছেন কফিন বন্দী লাশ হয়ে।
যেহেতু প্রবাসীরা নিজের হাতে খুব বেশি টাকা রাখেন না তাই মৃত্যুর পর লাশ দেশে পাঠানো নিয়ে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। মাঝে মাঝে বাংলাদেশ দূতাবাস গুলো থেকে সহযোগিতা পাওয়া গেলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা হয় নগণ্য আবার অনেক ক্ষেত্রে সেরকম সাড়া মেলে না। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজন প্রবাসীর লাশ দেশে পাঠানোর জন্য ধারে ধারে ঘুরে টাকা সংগ্রহ করতে হয়। এতে প্রবাসীদের লাশ দেশে পাঠাতে হয় বিলম্ব আবার অনেকের লাশটুকু দেশের মাটিতে যাওয়ার সুযোগ পায়না টাকার অভাবে।
প্রতিনিয়ত প্রবাসীদের জীবন শেষ হচ্ছে, পাওয়া যাচ্ছে মৃত্যুর খবর। তাই প্রবাসে বসবাসরত সচেতন মহল মনে করেন মৃত্যুর পরে টাকা না তুলে মৃত্যুর আগে যদি একটি ফান্ড তৈরি করা যায় তাহলে যে কোনো সময় এই ফান্ড থেকে অনুদান দেওয়া যাবে। এই ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, কমিউনিটির নেতৃত্বস্থানীয় ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সবার আগে এগিয়ে আসার আহবান জানান।
দেশে পরিবার আত্মীয়স্বজন থাকলেও একজন প্রবাসীর কষ্ট একজন প্রবাসীই বুঝে আর প্রবাসের সম্পর্ক গুলো রক্তের না হলেও হয়ে যায় আত্মার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রবাসীর সাথে কথা বলার পর তাদের কথায় যেন সকল প্রবাসীদের কষ্ট ও আফসোসের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। একজন বলেন, “প্রিয় মানুষদের মায়া ত্যাগ করে প্রবাসে থাকাটা অনেক কষ্টের, যখন আপনজনকে মনে পড়ে তখন কাজের চাইতেও বেশি কষ্ট অনুভব হয়।
অন্য আরেকজন বলেন, “নিজের বুকের মাঝে কষ্ট চেপে রেখে পরিবারের সবাইকে ভালো আছি বলার নাম হলো প্রবাস জীবন।”
পাশ থেকে আরেকজন প্রবাসী ভাই আফসোস নিয়ে বলেন, “আমাদের প্রবাসীদেরকে কখনো কেউ বুঝতে চায় না, সবাই ভাবে আমরা শুধু টাকার মেশিন।
সকল প্রবাসীদের মনের চাওয়া এই টাকার মেশিন গুলোর লাশ যেন টাকার অভাবে আর বিদেশের মাটিতে শায়িত না হতে হয় কিংবা হসপিটালের মর্গে পড়ে থাকতে না হয়।
