
ওমর ফারুক (শামীম), ইউরোপ প্রতিনিধি: “পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম বন্ধুর খবর পাইলাম না”, “মহেশখালীর পান এর খিলি তারে বানাই খাওইতাম”, “এসো তবে বসে খাও এক খিলি পান, চাইলে শোনাতে পারি প্রিয় কোন গান”, “পান খাইলে সুপারি লাগে, আরো লাগে চুন ঘষিয়া ঘসিয়া জলে পীরিতের আগুন”। পান নিয়ে আছে এমন আরো অনেক গান, কবিতা, প্রবাদ, যা আমাদের সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ।
সুপরিচিত এই খাবার পান যার বৈজ্ঞানিক নাম “পাইপার বিটল” আর সংস্কৃত ভাষায় “ভূজঙ্গলতা পত্র” অহমিয়া ভাষায় এর নাম “তাম্বূল ” বাংলা ও হিন্দি ভাষায় “পান” বলে পরিচিত। পান সংস্কৃত পর্ণ যার অর্থ “পাতা”। এটা সুপারি ও অন্যান্য মসলার সংমিশ্রনের একটি খাবার। প্রত্নতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক এবং উদ্ভিদ্বিদ্যা সংক্রান্ত প্রমানের উপর ভিত্তি করে পান চিবানো অস্টোনেশিয়ানের সাথে জোরালোভাবে জড়িত,অনেক ক্ষেত্রে ফিলিপাইনের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।
সময়ের সঙ্গে হরেক রকম নামে নামকরণ হয়েছে পানের। যেমন, বেনারসি পান, শাহি পান, কাশ্মীরি পান, জামাই-বউ পান, প্রেমিক-প্রেমিকা পান, ভালোবাসার পান, হানিমুন পান আরো কত কী। বাঙালি অতিথিপরায়ণ জাতি। খাবারের পর পান দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন বাঙালি জাতির প্রাচীন ঐতিহ্য। যে নামেই ডাকা হয় না কেন পান তো পানই। যুগে যুগে বহু মানুষ খয়ের, সুপারি, মহরি ও কালিজিরা সহ বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণ ঘটি পান খেয়ে থাকে। এ সকল উপাদানের জন্য পান চিবুতে চিবুতে এক সময় পানি বা থুথু হয়ে যায় এবং লাল খয়েরের কারণে মুখে লাল লালার তৈরি হয়। খেয়ে ঠোঁট লাল করাই এর পানের অন্যতম উদ্দেশ্য। পানে এখন আর শুধু চুন, সুপারি আর খয়েরই ব্যবহৃত হয় না। মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, মোরব্বা, খেজুর, কিচমিচ, খোরমা, তানশিন, তেরেঙ্গা, এলাচ, চমন বাহার, তরক, ইমাম, নারকেল, সেমাই, ঝুরা ইত্যাদি।
এই রসিক ও জনপ্রিয় খাবার “পান”ই এখন ইউরোপের দেশ পর্তুগালের বিড়ম্বনার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা পান খেতে পছন্দ করেন তারা পৃথিবীর যেপ্রান্তেই থাকেন না কেন পানের সন্ধান পেলে আর মুখ বন্ধ করে রাখতে পারেন না। পান পর্তুগালে দূর্লভ হওয়ায় দাম ও দেশি। দাম বেশি হওয়ার অনেকের কাছে এটা লাভজনক ব্যবসায় পরিনত হয়েছে। বেশ কয়েকমাস করে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে বাংলাদেশী অধ্যষিত এলাকা মারতিম মুনিজে রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় ও বাংলাদেশিদের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে পান বিক্রি শুরু হয়েছে।
পান বিক্রি ও খাওয়া কোন অপরাধ নয় বরং বরং অভিজাত্যের পরিচয় বহন করে। কিন্তু যখন পান খেয়ে পানের পিক দিয়ে রাস্তাঘাট, বিল্ডিং, দেয়াল, পার্ক সহ বিভিন্ন স্থাপনা নষ্ট করে তখনই এই রসিক ও অভিজাত খাবার হয়ে ওঠে বিড়ম্বনার কারন। কিছু অসচেতন মানুষ পান খেয়ে পানের পিক যেখানে সেখানে ফেলার কারনে পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি অনেক বছর ধরে সুনামের সাথে পর্তুগালে বসবাস করা বাংলাদেশীদের নামের সাথে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে নোংরা জাতির বদনাম।
ইউরোপের প্রতিটা দেশেই রাস্তার পাশে অনুমোদনহীন দোকান অবৈধ ও অপরাধ। রাস্তার পাশের এই অনুমোদনহীন পানের দোকানের জন্য রাস্তায় তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ভোগ। তাই কেউ কেউ এখানে এই পান বিক্রি বন্ধের বেপারেও মতামত দেন। সচেতন মহল মনে করেন এটা সভ্য দেশে অসভ্য একটা আচরণ। তারা বলেন ইউরোপের প্রতিটা দেশের মানুষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন তাদের দেশকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার আর কিছু অসচেতন মানুষ সভ্য দেশে এসেও যেখানে সেখানে পানের পিক ফেলে পরিবেশ নষ্ট করে নোংরামি ও অসভ্যতার পরিচয় দিচ্ছে। অনেকে আবার এই অসভ্যতা ও নোংরামির জন্য পর্তুগালের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ ও কামনা করেন।

এই প্রসঙ্গে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের শুভপুর ইউনিয়নের কাদৈর গ্রামের আবু হানিফ বলেন, আমি প্রায় ৮ বছর ধরে পর্তুগাল বসবাস করতেছি। এখানে বাংলাদেশিদের একটা সুনাম রয়েছে তাদের কাজ, ব্যবহার, আচরণ ও ভদ্রতার জন্য। কিন্তু গত ৫/৬ মাস ধরে এখানে খোলাখুলি ভাবে পানের ব্যবসা ও খাওয়া শুরু হয়েছে তা আগে ছিল না। পান খাওয়াতে কোন সমস্যা নেই কিন্তু পানের পিক যেখানে যেখানে ফেলে পরিবেশ নষ্ট করাতে বিদেশিদের কাছে আমাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। তাই তার পরামর্শ, যারা পান খান তারা যেন আরো সচেতনতার পরিচয় দেন। যেখানে সেখানে পানের পিক ফেলে পরিবেশ নষ্ট না করেন।
