দৈনিক জাগো বাংলাদেশ
বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক

সোনারগাঁও ঐতিহাসিক ভবনগুলোর সংস্কার না করায় ধ্বংসের পথে

0 65

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

নিজস্ব প্রতিবেদক

- Advertisement -

নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা সোনারগাঁও। প্রাচ্যের রহস্য নগরী হিসেবে সুপরিচিত ঐতিহাসিক সোনারগাঁয়ের পানাম নগরীর একাধীক পুরাতন ভবন সংস্কারের অভাবে এখন ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। ঐতিহাসিক ভবনগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে সোনার বাংলাদেশের সোনারগাঁয়ে। সংস্কারের অভাবে এ নগরীর কয়েক শত বছরের পুরনো ভবনগুলো রয়েছে হুমকির মুখে। বহুদিন ধরে ভবনগুলোর সংস্কার কাজ না হওয়ায় ভবনগুলোর প্রলেপ, ইট সুরকি ও নকঁশা খসে পড়তে শুরু করেছে। এ নগরীর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ নগরীর প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ করতে সর্বাত্তক চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ প্রতœতত্তব অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৬১০ সালের পূর্ব পর্যন্ত সোনারগাঁও ছিল স্বাধীন সুলতানী আমল সে সময় সোনারগাঁও ছিল বাংলার অন্যতম রাজধানী। সে সময় রাজধানীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে থাকে পানাম নগরীতে ভবন। সুলতানী আমলের পর থেকে ধীরে ধীরে পানাম নগরী গড়ে উঠতে শুরু করে। মূলত উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ধনাঢ্য হিন্দু জমিদারদের মাধ্যমে পানাম নগরীর গোড়া পত্তন ঘটে। এ নগরীটি পূর্ব দক্ষিনে ৬০০ মিটার দীর্ঘ ও ৫ মিটার প্রশস্ত। এখানকার অধিকাংশ পুরাতন ভবনগুলো এক তলা থেকে তিন তলা বিশিষ্ট্। প্রতিটি ভবনেই ইউরোপীয় স্থাপত্য রীতির সাথে মোঘল স্থাপত্য রীতির মিশ্রন লক্ষ করা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পৃথিবীর ১০০টি বিলুপ্ত প্রায় ঐতিহাসিক শহরের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও পানাম নগরী একটি। ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ড ২০০৬ সালে পানাম নগরীকে বিশ্বের ধ্বংসপ্রায় ১০০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় স্থান দিয়েছে। গত ২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রতœতত্তব অধিদপ্তর পানাম নগরীকে আংশিক অবৈধ দখলদার মুক্ত করে প্রথমবারের মতো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল।
সে সময় সংস্কারের নামে পানাম নগরীর ৯টি ভবনের মূল সৌন্দর্য নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে প্রতœতত্তব অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে । যেনতেনভাবে চুন সুরকির প্রলেপ দেয়া হয় এ ভবনগুলোতে। ফলে এ সংস্কার কাজ বন্ধের জন্য প্রতিবাদ জানায় জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতাত্তিবক বিশেষজ্ঞ দল ও স্থানীয় সুশীল সমাজের লোকজনসহ স্থানীয়রা। তীব্র প্রতিবাদের মুখে বন্ধ হয়ে যায় বিতর্কিত এ সংস্কার কাজ।
গত ২০০৯ সালে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে পানাম নগরীকে সম্পূর্নভাবে দখল মুক্ত করার জন্য প্রশাসনের বেশ ভূমিকা ছিল। তারা সফলও হয়েছেন। বর্তমানে এ নগরীকে টিকেটের আওতায় আনা হয়েছে। এখানে প্রবেশ করতে হলে জনপ্রতি ১৫ টাকা’র টিকেট সংগ্রহ করতে হয়। বিদেশী পর্যটকদের জন্য প্রবেশ মূল্য ১০০ টাকা এবং সার্কভূক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য প্রবেশ মূল্য ৫০টাকা নির্ধারন করেছে কতৃপক্ষ।
এদিকে পানাম নগরী টিকেটের আওতায় আসার পর নগরীর দক্ষিন দিকের ৩৮ নাম্বার ভবনটিতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন একটি খাবারের দোকান স্থাপন করেছে। দোকানে একাধিক ফ্রিজ বসানো হয়েছে পাশাপাশি ভবনের অভ্যন্তরে গ্রাহকদের জন্য টেবিল চেয়ারও বসানো হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতœতত্তব অধিদপ্তরের মহা পরিচালক আলতাফ হোসেন এর সাথে পানাম নগরীর ভবনগুলোর সংস্কার বিষয় জানতে চাইলে তিনি জানান, পানাম নগরী সংস্কারের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। তাই এ সংস্কারের ব্যাপারে দক্ষিণ কোরিয়া ভিত্তিক একটি বহুজাতিক কোম্পানি’র সাথে আমরা কথা বলেছি। সংস্কারের জন্য ওই কোম্পানির সাথে প্রত্নত্তব অধিদপ্তরের একটি চুক্তি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে ইয়াংওয়ান কর্পোরেশন নামের ওই কোম্পানির চেয়ারম্যান ও কোরিয়া ইপিজেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মি. কিহাক সাং পানাম নগরী পরিদর্শনও করেছেন। আমরা চাইছি ধাপে ধাপের পানাম নগরীর সংস্কার কাজ সম্পন্ন করতে।
কবে নাগাদ এ সংস্কার কাজ শুরু হতে পারে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা সঠিক বলা যাচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করছি দ্ররুত এ কাজ শুরু করতে, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়। আমাদের আন্তরিকতার অভাব নেই। ঐতিহাসিক স্থানগুলো টিকে থাক সে লক্ষ্যেই কাজ হচ্ছে।
প্রতœতাত্ত্বিক ভবনের অভ্যন্তরে খাবারের দোকান স্থাপন প্রতœতত্ত্বিক নিদর্শনের হুমকি কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ খাবারের দোকান পর্যটন কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে এখানে করা হয়েছে। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনার ভেতর খাবারের দোকান রয়েছে। এখানে বসে খেলে কোন সমস্যা নেই। তবে এসব স্থাপনার ভেতর রান্না করা যাবে না এবং কোন নকঁশা নষ্ট করা যাবে না।
পানাম নগরীর রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের ভান্ডার রক্ষক মো. জাহাঙ্গির হোসেন বলেন, পানাম নগরে বর্তমানে ছোট বড় মোট ৫২টি প্রাচীন ভবন টিকে আছে। সারিবদ্ধ অবস্থায় এ নগরীর উত্তরে ৩১টি ও দক্ষিনে ২১টি প্রাচীন ভবন রয়েছে। পানাম নগরের ১০টি ভবন সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ন। সামান্য ভুমিকম্প কিংবা একটানা বৃষ্টিতে এ ভবনগুলো ধ্বসে পড়তে পারে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ঝঁকিপূর্ন ভবনগুলোসহ বাকি ভবনগুলোতেও কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। কর্তপক্ষের নির্দেশে ভবনগুলোর প্রবেশ দ্বার আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ন ভবনে সাইন বোর্ড লাগিয়ে দেয়া হয়েছে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে।
লেখক ও সাংবাদিক বাবুল মোশাররফ বলেন, আমি ছোট বেলায় পানাম নগরীতে শতাধিক ভবন দেখেছি। অযতœ আর অবহেলায় বিগত চল্লিশ পঞ্চাশ বছরে এ ভবন কমে এখন দাড়িয়েছে মাত্র বায়ান্নটিতে। ভবনগুলোর দ্রæত সংস্কার প্রয়োজন। তা নাহলে অচিরেই হারিয়ে যাবে ঐতিহাসিক পানাম নগরীর সুন্দর্যসহ প্রাচীন ভবনগুলো। তবে সংস্কারের নামে যেন ভবনগুলোর আদি রূপ নষ্ট না হয় সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। আদি রূপ ঠিক রাখতে না পারলে একরকম ধবংস বলা হবে ভবনগুলোকে।
ইতিহাস গবেষক শামসুদ্দোহা চৌধুরী বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে ইতিমধ্যে এ নগরীর প্রায় ২০টি ভবন সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকিগুলোও রয়েছে ঝুঁকির মুখে। সামান্য ভূমিকম্পই এ নগরী ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। পানাম নগরীর আদি সৌন্দর্য ঠিক রেখে অচিরেই এটি সংস্কার ও সংরক্ষন করা জরুরী। এ নগরী ও পুরাতন ভবনগুলো দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষনীয় স্থান। বর্তমানে এ নগরীর প্রতিটি ভবনের প্রবেশ দ্বার বন্ধ থাকার কারণে এখানে আগত দর্শনার্থীরা ভবনগুলোর অভ্যন্তরের মূল সৌন্দর্য উপভোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিদিন। সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত এ নগরীর প্রাচীন জৌলুস ফিরিয়ে আনতে পারলে পানাম নগরীতে পর্যটক সংখ্যা বাড়বে। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। সে সাথে ঐতিহাসিক পানাম নগরীর পরিচিতি সাথে বাংলাদেশের নামটির সুপরিচিতি বড়বে বহিরবিশ্বে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More